সম্মানিত দর্শক আপনাকে স্বাগতম। আমাকে Facebook instagram Telegram এ পাবেন। কামরুলকক্স: মায়ের দুধ শিশুর শ্রেষ্ঠ খাবার

মায়ের দুধ শিশুর শ্রেষ্ঠ খাবার



১-৭ আগস্ট বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহপালিত হচ্ছে। জন্মের পর থেকে ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধই শিশুর খাবার হিসেবে যথেষ্ট। ছয়মাস থেকে ঘরে তৈরি বাড়তি খাবার চলবে মায়ের দুধের পাশাপাশি। এসব নিয়ে এবারের বিশেষ আয়োজন মায়ের দুধ শিশুর জন্য সর্বোত্তম খাবার। এ খাবারের সমকক্ষ, শ্রেষ্ঠ বা বিকল্প অন্য কোনো খাবার নেই। জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করতে হয় এবং অব্যাহতভাবে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু বুকের দুধই খাওয়াতে হয়। ছয় মাস পর মায়ের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজনমতো (ডাল, ভাত, সবজি, মাছ, মাংস, ডিম বা কলিজা) খাওয়াতে হয়।

বাড়তি খাবার প্রস্তুতের আগে এবং শিশুকে তা খাওয়ানোর আগে মাকে সাবান দিয়ে হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জন্মের পর এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো সম্ভব হলে ৩১ শতাংশ নবজাতকের মৃত্যু রোধ করা যায়, অর্থাৎ ৫৭ হাজার শিশুর জীবন রক্ষা পায়। ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়ালে ১৩ শতাংশ শিশুর জীবন রক্ষা পায় এবং বুকের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি বাড়তি খাবার দেওয়া গেলে অতিরিক্ত ৬ শতাংশ শিশুর মৃত্যু (পাঁচ বছরের কম) রোধ করা সম্ভব হয়।

বলা হয়, ৯৫ লাখ শিশু তাদের বয়স পাঁচ বছর পূরণ হওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করে এবং এর দুই-তৃতীয়াংশের মৃত্যু জীবনের প্রথম বছরেই ঘটে। এ মৃত্যুর ৩৫ শতাংশই অপুষ্টির কারণে হয়। মাতৃদুগ্ধ পানের গুরুত্ব বিবেচনা করে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালিত হয়। বাংলাদেশেও ১৯৯২ সাল থেকে সাধারণভাবে এবং ২০০৫ সাল থেকে সরকারিভাবে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালিত হয়ে আসছে। সেই থেকে প্রতিবছর বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহে মাতৃদুগ্ধ দানের বিভিন্ন বিষয় আলোকপাত করা হচ্ছে। সবার জানা কথাগুলোই বলতে হবে আবার মায়ের দুধই সকল শিশুর সবচেয়ে ভালো খাবার

মায়ের দুধের উপকারিতাঃ
একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য যেসব উপাদান দরকার, তা সঠিক পরিমাণে একমাত্র মায়ের দুধেই পাওয়া যায়। জন্মের পরপরই শিশুকে শালদুধ খাওয়ালে শিশু প্রথম টিকা পায়। এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, শিশু সুস্থ থাকে এবং শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও বুদ্ধির বিকাশ যথাযথভাবে হয়। শালদুধ খাওয়ালে শিশুর পেটের কালো পায়খানা তাড়াতাড়ি পরিষ্কার হয়। এতে জন্ডিস হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। দ্রুত শালদুধ খাওয়ালে তা মায়ের জরায়ুর ফুল পড়তে সাহায্য করে। এতে মায়ের রক্তক্ষরণ কম হয়। ফলে মা রক্তশূন্যতা থেকে রক্ষা পান। মায়ের দুধ নিরাপদ, শিশু সহজে হজম করতে পারে। এ কারণে অ্যালার্জি কম হয়। শালদুধ শিশুকে ডায়রিয়া, সেপসিস, নিউমোনিয়া, কান পাকা ইত্যাদি রোগ থেকে রক্ষা করে। শুধু মায়ের দুধেই বুদ্ধি বিকাশের একমাত্র জীবন্ত উপাদন ডিএইচএ আছে, এতে শিশু মেধাবী হয়। শালদুধ খাওয়ালে মা ও শিশুর মধ্যে একটা অবিচ্ছেদ্য আত্মিক বন্ধনের সৃষ্টি হয়। শিশু মায়ের দুধ খেলে মায়ের স্তনে ও জরায়ুতে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। মায়ের ডায়াবেটিস, উচ্চ-রক্তচাপ ও মুটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। এ ছাড়া প্রথম ছয় মাসের মধ্যে মায়ের গর্ভবতী হওয়ার আশঙ্কা ৯৮ শতাংশ কমে যায়। মায়ের দুধ খাওয়ালে শিশুর জন্য অতিরিক্ত খাবার কেনার প্রয়োজন হয় না। এতে পরিবার ও সরকারের খরচ বাঁচে। শিশু ঘন ঘন অসুস্থ হবে না, ফলে চিকিৎসা খরচ কমে যাবে। কৌটার দুধ আমদানি না করার জন্য দেশের বিদেশি মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ প্রতিবছর তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা মূল্যের গুঁড়ো দুধ আমদানি করে। এই পরিমাণ টাকায় ছয় বছর ধরে দেশে ৪৮২টি উপজেলায় সমন্বিত পুষ্টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়।

শিশুদের গুঁড়ো দুধ খাওয়ানোর বিরূপ ফলঃ
লাগামহীনভাবে শিশুকে গুঁড়ো দুধ খাওয়ানোয় এ দেশের শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে; পরবর্তী সময়ে অপুষ্টিতে ভুগছে এবং মৃত্যুবরণ করার ঘটনাও ঘটছে। গরিব মায়েরা গুঁড়ো দুধের একটি কৌটা অনেক দাম দিয়ে কেনে এবং বেশি দাম বলে এটি দু-তিন সপ্তাহ ধরে পাতলা করে এবং নোংরা বোতলে খাওয়ায়। অনেক গুঁড়ো দুধই শতভাগ জীবাণুমুক্ত নয়। এ কারণে শিশুর ডায়রিয়া বা নিউমোনিয়া হতে পারে এবং অপুষ্টিতে ভুগে মৃত্যুবরণ করতে পারে। আমাদের মতো গরিব দেশে একটা শিশুকে গুঁড়ো দুধ খাওয়ানোর অর্থ তাকে অসুস্থতার দিকে ঠেলে দেওয়া। শিশুখাদ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো শিশুদের গুঁড়ো দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে বিজ্ঞাপন দিয়ে মা-বাবাকে প্রলুব্ধ করে। অনেক চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী জেনে বা না জেনে এসব কোম্পানিকে সহায়তা করেন এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন।

মাদার সাপোর্ট গ্রুপঃ
শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর রীতি একটি সামাজিক প্রথা। মায়ের দুধ শিশুকে সঠিকভাবে খাওয়ানোর জন্য মাকে সাহায্য করতে হয়। বাস্তবতা হলো, এ দেশের মায়েরা শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা পান না। এ কারণে সন্তানকে পূর্ণ মেয়াদে সফলভাবে দুধ খাওয়াতে পারেন না। এ জন্য গ্রাম, মহল্লা বা কমিউনিটিতে মাদার সপোর্ট গ্রুপ গড়ে তোলা প্রয়োজন।


মাতৃত্বকালীন সুরক্ষাঃ
মায়েদের মাতৃদুগ্ধ দান থেকে বিরত থাকার আর একটি সাধারণ কারণ হলো প্রসব-পরবর্তী পুনরায় কাজে যোগদান। চাকরিজীবী মায়েরা যাতে শিশুকে ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন, সে জন্য তাঁদের মাসিক বেতন অব্যাহত রাখাসহ এই ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়ার বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। কর্মস্থলে একটি কক্ষ রাখা যেতে পারে, যেখানে তাঁরা শিশুকে দুধ খাওয়াতে পারেন অথবা কাজের সময় তাঁদের কিছুক্ষণ বিরতি দেওয়া যেতে পারে, যাতে তাঁরা শিশুকে খাইয়ে আসতে পারেন।

শেষ কথাঃ
৬৪ শতাংশ শিশুকে শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানো সম্ভব হয়েছেএ সূচক ধরে রাখতে হবে; ঊর্ধ্বমুখী করতে হবে। প্রসব-পূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী যত্ন বাড়াতে হবে। জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে এবং অব্যাহতভাবে ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধু মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে। ছয় মাস পর মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুকে ঘরে তৈরি বাড়তি খাবার দিতে হবে।

 


মো. এখলাসুর রহমান
পরিচালক, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান

 সূত্রঃ প্রথম আলো, আগষ্ট ২০১২ খ্রিঃ

0 মন্তব্য:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Comments করার জন্য Gmail এ Sign in করতে হবে।