সম্মানিত দর্শক আপনাকে স্বাগতম। আমাকে Facebook instagram Telegram এ পাবেন। কামরুলকক্স: কৃত্রিম প্রজননে কাঁকড়ার পোনা!

কৃত্রিম প্রজননে কাঁকড়ার পোনা!


কাঁকড়ার চাহিদা বিশ্বজুড়েদেশেও বাড়ছে কদরকিন্তু কাঁকড়া উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না পর্যাপ্ত পোনার অভাবেকারণ, পোনার জন্য ভরসা প্রাকৃতিক উৎসফলে পোনা আহরণে পোহাতে হয় নানা ঝক্কি চাষিদের সেই সমস্যার দিন বুঝি ফুরাল এবারকক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তিকেন্দ্রের এক দল গবেষক জাগিয়েছেন আশার আলোসফল হয়েছেন কৃত্রিম প্রজননে কাঁকড়ার পোনা উৎপাদনে


চার সদস্যের গবেষক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. ইনামুল হকঅপর তিন সদস্য হলেন কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শাহাজাত কুলী খান, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিসের কনসালট্যান্ট অং ছিন ও ওয়ার্ল্ডফিস এআইএ (অ্যাকুয়াকালচার ফর ইনকাম অ্যান্ড নিউট্রিশন) ল্যাব ব্যবস্থাপক পার্থ প্রতিম দেবনাথসামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তিকেন্দ্র ও ওর্য়াল্ডফিস (ইউএসএআইডি-এআইএন প্রকল্প) যৌথভাবে এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ২ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টায় সৈকতের লাবণী পয়েন্টের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তিকেন্দ্রে স্থাপিত ল্যাব ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে বিশেষ পদ্ধতিতে খাদ্য তৈরি করে উৎপাদিত কাঁকড়ার পোনা সংরক্ষণ করা হচ্ছে পানিভর্তি বোতলে ভাসমান এই পোনা খালি চোখে দেখা যাচ্ছে না অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে দেখলে জীবন্ত পোনার নড়চড়া প্রত্যক্ষ করা যায় 

গবেষণা: বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তিকেন্দ্রে ২০০৩ সালে প্রথম কাঁকড়ার পোনা উৎপাদন ও চাষ বিষয়ে গবেষণা শুরু হয়২০১৪ সালের নভেম্বরে সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তিকেন্দ্র এবং ওয়ার্ল্ডফিসের এআইএন প্রকল্পের যৌথ তত্ত্বাবধানে কাঁকড়ার পোনা উৎপাদনের নতুন গবেষণা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়উখিয়ার রেজুখালের তীরে নিরিবিলি হ্যাচারিতে শুরু হয় কাঁকড়া নিয়ে গবেষণাগভীর সমুদ্র থেকে ধরে আনা মাকাঁকড়া এই হ্যাচারিতে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করে ডিম থেকে বের করে আনা হয় জুইয়া (কাঁকড়া ডিম ছাড়ার পর পোনার প্রাথমিক অবস্থা জুইয়া)এরপর সেই জুইয়া প্রযুক্তিকেন্দ্রের বিশেষ ল্যাবে সংরক্ষণ করে বাঁচিয়ে রাখা হয়দীর্ঘ গবেষণার পর ২ ফেব্রুয়ারি কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনে সক্ষম হয় গবেষক দল

দলের প্রধান মো. ইনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘হ্যাচারিতে কাঁকড়ার পোনা উৎপাদন অপেক্ষাকৃত নতুন প্রযুক্তিএশিয়ার অগ্রসর দেশ ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও ভারতে কাঁকড়ার হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা পেলেও ব্যাপকভাবে হয়নিএ ক্ষেত্রে মূল বাধা হলো পোনার বাঁচার হার কমএকটি পরিপক্ব কাঁকড়ার ডিম দেওয়ার ক্ষমতা ৮০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪০ লাখকিন্তু পোনা বাঁচার হার গড়ে ১০ শতাংশ সর্বশেষ গত এক মাসে গবেষক দল হ্যাচারিতে তিনটি পরিপক্ব মাকাঁকড়া (মাড প্রজাতি, স্থানীয় নাম শিলা কাঁকড়া) সংরক্ষণ করে প্রায় ৩২, ১৬ ও ২৬ লাখ হ্যাচিংপরবর্তী জুইয়া পাওয়া গেছেপূর্ণাঙ্গ পোনায় পরিণত হতে পাঁচ ধাপ জুইয়া ও এক ধাপ মেগালোপা অতিক্রম করতে হয়এ ক্ষেত্রে আমরা সফল হয়েছি বাংলাদেশে আগে পরিচালিত গবেষণায় হ্যাচিংয়ের তথ্য পাওয়া গেলেও জুইয়া ধাপ পার হওয়ার তথ্য নেইএখন বাণিজ্যিকভাবে কাঁকড়ার পোনা উৎপাদনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই চলছেএ ছাড়া আমাদের গবেষণা কার্যক্রমের বিস্তারিত আন্তর্জাতিক জার্নালে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছেকাঁকড়া গবেষকেরা জানান, উপকূলের প্যারাবনবিধৌত মোহনায় কাঁকড়ার আবাস হলেও পরিপক্ব স্ত্রী কাঁকড়া ডিম ছাড়ার জন্য গভীর সমুদ্রে চলে যায়ডিম ছাড়ার পর জুইয়া সমুদ্রের গভীর এলাকা থেকে মেগালোপা পর্যায়ে জোয়ারের পানিতে ভেসে পুনরায় এরা প্যারাবন এলাকায় চলে আসেএরপর মোহনা ও প্যারাবন এলাকায় পরিপক্ব হওয়ার পর পুনরায় গভীর সমুদ্রে চলে যায়এভাবে কাঁকড়ার জীবনচক্র চলতে থাকে

চাষে নতুন সম্ভাবনা: নিরিবিলি হ্যাচারির পরিচালক লুৎফর রহমান বলেন, দীর্ঘ গবেষণার পর মৎস্যবিজ্ঞানীরা এখন কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ডিম থেকে কাঁকড়ার পোনা উৎপাদন করেছেনএরপর এই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন ও বিপণন শুরু হলে দেশে কাঁকড়া চাষের নতুন সম্ভাবনা দেখা দেবেসনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে চাষিরা এই পদ্ধতি অনুসরণকরবেনঅং ছিন জানান, হ্যাচারিতে কাঁকড়ার পোনা উৎপাদনে পানি বিশুদ্ধকরণ, গুণগতমান রক্ষা, রোগ প্রতিরোধ ও সর্বোপরি খাদ্য হিসেবে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণকাঁকড়ার পোনা লালনের জন্য ওয়ার্ল্ডফিসের সহায়তায় ইতিমধ্যে সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তিকেন্দ্রে পূর্ণাঙ্গ লাইভ ফিড কালচার ল্যাবস্থাপন করা হয়েছে, যা কাঁকড়ার হ্যাচারি প্রতিষ্ঠায়অবদানরাখবেপার্থ প্রতিম দেবনাথ জানান, কক্সবাজারে হ্যাচারিতে কাঁকড়ার পোনা উৎপাদনের প্রাথমিক সফলতা অর্জন করায় চিংড়ির হ্যাচারি মালিকেরা এই প্রযুক্তি কাজে লাগাতে আগ্রহীএ ব্যাপারে হ্যাচারি মালিকদের পাশাপাশি কাঁকড়াচাষিদের নিয়ে আলাপআলোচনা চলছেদেশে কাঁকড়া চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে রপ্তানির বিপরীতে বছরে এক হাজার কোটি টাকা অর্জন সম্ভব

রপ্তানি বাণিজ্যে দেশের কাঁকড়া: মহেশখালী কাঁকড়া উৎপাদন ও রপ্তানিকারক বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি জসিম উদ্দিন জানান, শুধু মহেশখালী থেকে ৩২টি প্রতিষ্ঠান দৈনিক পাঁচ মেট্রিক টন কাঁকড়া রপ্তানির জন্য ঢাকায় পাঠাচ্ছেএই কাঁকড়া রপ্তানি হচ্ছে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও হংকং১০০ কেজি কাঁকড়ার স্থানীয় বাজারমূল্য ৫০ হাজার টাকাসেই হিসাবে পাঁচ মেট্রিক টন কাঁকড়ার দাম (প্রতিটন ৫ লাখ ৫০ হাজার) ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকাগত বছর সমিতির ৮৯ জন সদস্য মহেশখালী থেকে ৯৮ কোটি টাকার কাঁকড়া রপ্তানি করেছেনজেলার চকরিয়া, পেকুয়া,টেকনাফ থেকে রপ্তানি হয়েছে আরও ৭০কোটি টাকার কাঁকড়ামহেশখালীর ধলঘাটার কাঁকড়াচাষি সিরাজ উল্লাহ বলেন, ‘উপকূল থেকে ৪০ থেকে ১৫০ গ্রাম ওজনের ছোট কাঁকড়া সংগ্রহ করে দেড় একরের ঘেরে লালন পালন করিতারপর ২০ থেকে ২৫ দিন পর রপ্তানির জন্য সেই কাঁকড়া চট্টগ্রাম পাঠাইএতে প্রতিবছর এক থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ থাকছেকিন্তু পোনা পেলে কাঁকড়া চাষ করে উৎপাদন কমপক্ষে ১০ গুণ বেড়ে যেতমহেশখালীর ধলঘাটা, মাতারবাড়ী, গোরকঘাটা, কুতুবজোম, টেকনাফের হোয়াইক্যং, লম্বাবিল, উনচিপ্রাং, কাঞ্জরপাড়া, উলুবনিয়া; উখিয়ার বালুখালী, রহমতেরবিল, আঞ্জুমানপাড়া, ঘুমধুম; পেকুয়ার মগনামা, উজারটিয়া, কড়য়ারদিয়া; চকরিয়ার বদরখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় আট হাজার মানুষ কাঁকড়া চাষের সঙ্গে জড়িত মহেশখালীর কালারমারছড়ার কাঁকড়া ব্যবসায়ী সনজিত দাশ বলেন, উপকূলে এখন রপ্তানিযোগ্যগ্রেড কাঁকড়া বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা, ‘বিগ্রেড ৫০০ থেকে ৮০০ টাকাসিগ্রেড কাঁকড়া স্থানীয় বাজারে ১৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছেনির্বিচারে কাঁকড়া আহরণের ফলে এখন বিগ্রেড কাঁকড়াপাওয়াযাচ্ছেনা সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে ২০ প্রজাতির কাঁকড়া রয়েছেএর মধ্যে শিলা কাঁকড়ার আন্তর্জাতিক বাজার ভালোআধুনিক প্রযুক্তিতে এই কাঁকড়ার উৎপাদন করা গেলে রপ্তানির বিপরীতে বছরে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।



সূত্রঃ প্রথম আলো

0 মন্তব্য:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Comments করার জন্য Gmail এ Sign in করতে হবে।