সম্মানিত দর্শক আপনাকে স্বাগতম। আমাকে Facebook instagram Telegram এ পাবেন। কামরুলকক্স: টাইটানিক ট্র্যাজেডির শতবর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য!!

টাইটানিক ট্র্যাজেডির শতবর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য!!



আজ থেকে শতবর্ষ আগে ১৯১২ সালের ১১ এপ্রিল নিউইয়র্কের উদ্দেশে ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন বন্দর ত্যাগ করে টাইটানিক। যাত্রার চতুর্থ দিনের মাথায় ১৪ এপ্রিল রাত ১১টা ৪০ মিনিটে আটলান্টিক মহাসাগরের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায় বিশালাকার এ জাহাজটি। সমুদ্রযাত্রার ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক এ জাহাজ দুর্ঘটনা নিয়ে এ পর্যন্ত অসংখ্য কাহিনী রচিত হয়েছে, লেখা হয়েছে শত শত বই। তৈরি হয়েছে বিগ বাজেটের চলচ্চিত্র। আটলান্টিকের শীতল পানিতে বিশালায়তন বরফের ভাসমান পাহাড়ের ধাক্কায় ডুবে যায় টাইটানিক। যদিও টাইটানিক ডোবার কারণ হিসেবে বরফ খণ্ডের সঙ্গে ধাক্কা লাগাকে কেউ অস্বীকার করেন না, কিন্তু এই ধাক্কার ফলে টাইটানিক কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়ে গেছে।

টাইটান গ্রিক পুরাণের বিশ্বকর্মা। কারিগরি দক্ষতা, স্থাপত্য-সৃষ্টির আরাধ্য দেবতা। তার নামে উৎসর্গ করতেই বিশ শতকের গোড়ায় তৈরি এ জাহাজের নাম রাখা হয়েছিল টাইটানিক। জাহাজটির পুরো নাম ছিল 'আরএমএস টাইটানিক', অর্থাৎ 'রয়্যাল মেল স্টিমার টাইটানিক'। প্রস্তুতকারক উত্তর আয়ারল্যান্ডের নামি কোম্পানি হারল্যান্ড অ্যান্ড উলফ। নির্মাতা সংস্থাটির নাম ছিল 'হোয়াইট স্টার লাইন'। এ টাইটানিক তৈরি করতে তখনকার দিনে খরচ পড়েছিল প্রায় ৭৫ লাখ ডলার। টাইটানিকের সাময়িক সাফল্যে তাদের মাথায় একটি নয়, ওই মাপের তিনটি যাত্রীবাহী জাহাজ তৈরির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু 'টাইটানিকে'র সলিল সমাধির সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু ঘটে তাদের যাবতীয় স্বপ্ন কল্পনার ও পরবর্তী আবিষ্কারের।

১৯১২ সালের ১১ এপ্রিল। ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন থেকে টাইটানিক প্রথম সমুদ্র যাত্রা শুরু করেছিল। সেদিন পৃথিবীজুড়ে উঠেছিল এক আলোড়ন। কারণ সে সময় এতবড় এক জাহাজ যে তৈরি করা যায়, তা মানুষের কাছে ছিল অকল্পনীয়। ১৯০৭ সাল থেকে এ জাহাজটি তৈরি শুরু হয়েছিল। তৈরি হতে সময় লেগেছিল মাত্র ছয় বছর। যখন থেকে এ টাইটানিক তৈরি হতে শুরু হয় তখন থেকেই এ বিশালাকার জাহাজটির পরিকল্পনার কথা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। আর তখন থেকেই এটি নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ ছিল না। ১৯০৭ থেকে ১৯১২_ এ ৬ বছরে প্রযুক্তিবিদ ও কারিগরদের অক্লান্ত পরিশ্রমে বেলফাস্টে 'টাইটানিকে'র জন্ম হয়। বিশালাকার এ জাহাজটির দৈর্ঘ্য ছিল ২৭৫ মিটার। আসন সংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজারের মতো।

জাহাজ ছাড়ার বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল, 'দ্য বিগেস্ট এভার ক্রিয়েশন অব ম্যান ইস অন দ্য মুভ'। শুধু আকার-আয়তনে নয়, ওজনেও 'টাইটানিক' ছিল বিশাল। ৬০ হাজার টন ওজনের একটি ছোটখাটো শহরের মতো জাহাজ পানিতে ভাসবে_ এটা শুনেই তখনকার অনেক মানুষ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। জাহাজটি এত সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল, এত সুব্যবস্থা ছিল যে, সে সময়কার অন্য যে কোনো বিলাসবহুল জাহাজকে টেক্কা দিয়েছিল টাইটানিক। অন্যসব জাহাজের তুলনায় এ জাহাজের টিকিট মূল্য ছিল অনেক বেশি। এ ছাড়া সব শ্রেণীর যাত্রীর কথা চিন্তা করে জাহাজে তিনটি পৃথক শ্রেণীর ব্যবস্থা ছিল।

টাইটানিকের প্রথম শ্রেণীর কেবিনের ভাড়া ছিল তখনকার হিসাবে ৩ হাজার ১০০ ডলার। আজকের দিনে ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারের সমান! আর ডেক টিকিট অর্থাৎ তৃতীয় শ্রেণীর ভাড়া ছিল ৩২ ডলার। আজকের হিসাবে তাও খুব একটা কম নয়। প্রায় ১ হাজার ৭০০ ডলারের কাছাকাছি। তবে সাউদাম্পটন থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে নিউইয়র্ক পৌঁছানোর এই বিশাল যাত্রাপথটা ছিল এত দুস্তর ও বিপদসঙ্কুল যে, ভাড়া নিয়ে কোনো যাত্রীই তখনকার দিনে খুব একটা মাথা ঘামাননি। ২২০০ যাত্রী ও কয়েকশ জাহাজের কর্মী নিয়ে নিউইয়র্কের অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছিল টাইটানিক। সারা বিশ্বের সংবাদপত্রে সেদিন টাইটানিক ছিল প্রধান শিরোনাম। কৌতূহলের শেষ ছিল না। যাত্রীরা এই ঐতিহাসিক যাত্রাপথের সঙ্গী হতে পেরে তাদের মধ্যে রোমাঞ্চের শেষ ছিল না। নিয়তির অভিশাপ, নিষ্ঠুর পরিহাস। কারণ ১১ এপ্রিল যাত্রা শুরুর দিনই দেখা দিয়েছিল অশনিসংকেত। 'ডক' থেকে জাহাজ ছাড়া মাত্রই 'নিউইয়র্ক' নামে এক যাত্রীবাহী জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লাগতে লাগতে সামান্যের জন্য বেঁচে যায় টাইটানিক। তারপর নাচ-গান, বিশ্রাম সবই চুটিয়ে উপভোগ করছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা। চারটি দিন তাদের খুব ভালোই কেটেছিল। কিন্তু সমস্যা হলো চতুর্থ দিন রাতে। ১৯১২ সালের ১৪ এপ্রিল রাতে উত্তর আটলান্টিকে নিউফাউন্ডল্যান্ডের কাছে পৌঁছতে না পৌঁছতেই পানির নিচে লুকিয়ে থাকা এক আইসবার্গের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগে টাইটানিকের।

প্রকৃতির খেয়ালের কাছে হার মানতে বাধ্য হলো আধুনিক প্রযুক্তি। ধীরে ধীরে সমুদ্রের নীল হিমশীতল পানিতে ডুবে যায় ৮৮৩ ফুট লম্বা ও ৯২ ফুট ৫ ইঞ্চি চওড়া ৬০ হাজার টনের গর্বের জাহাজ 'টাইটানিক'। এই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৫১৩ জন যাত্রী সমুদ্রগর্ভে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যান। আজ ১০০ বছর পরও সেই কালরাতের কথা ভাবলে শিউরে ওঠেন পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের মানুষ। অভিশপ্ত সেই দিন থেকে আজও আটলান্টিকের আড়াই মাইল গভীরে প্রকৃতির পরিহাসের মূর্তিমান সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে টাইটানিকের ধ্বংসস্তূপ। আর ঘটনাটি আজও এক 'মিথ' হয়ে গেছে। মানুষের বিজ্ঞান, বিশালত্ব, ঐশ্বর্য_ এসব কিছু যে প্রকৃতির একটা ছোট্ট ইশারায় কি অবলীলায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে, তারই প্রতীক টাইটানিক। আধুনিক নৌ-স্থপতি বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের মতে, টাইটানিকের কারিগরি কৌশল এতই দুর্বল ছিল, প্রকাণ্ড হিমশৈল কেন, যে কোনো জোর আঘাতেই নাকি ভেঙে পড়তে পারত 'টাইটানিকে'র বিস্তর ত্রুটিযুক্ত রিভেট। জাহাজে যথেষ্ট সংখ্যক লাইফবোট থাকলে যে আরও অনেক যাত্রীর প্রাণ বাঁচত সে বিষয় নিয়েও অনেক দোষারোপ করা হয়েছিল। ব্রিটেনের পাবলিক রেকর্ডস অফিসের নথিপত্র থেকে পরে জানা যায়, টাইটানিকের প্রথম শ্রেণীর যাত্রীরাই একমাত্র লাইফবোটের কাছাকাছি ছিলেন। তাদের অধিকাংশই ইংরেজিভাষী হওয়ায় তারা জাহাজের কর্মীদের নির্দেশ বুঝতে পেরেছিলেন। এর ফলে প্রথম শ্রেণীর যাত্রীদের মধ্যে ৯৭ শতাংশ মহিলা ও ৩৪ শতাংশ পুরুষ লাইফবোটের সাহায্যে নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে সমর্থ হন। দ্বিতীয় শ্রেণীর যাত্রীদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ মহিলা ও মাত্র ৮ শতাংশ পুরুষ এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে কোনোরকমে লাইফবোটে উঠতে পারেন। আর তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ মহিলা ও ১২ শতাংশ পুরুষ নিজেদের প্রাণ রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছিলেন।

১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যন্ত্রচালিত অনুসন্ধান যান সমুদ্রতলে ১৩ হাজার ফুট গভীরে নেমে খুঁজে পায় টাইটানিকের রাজকীয় অথচ করুণ ভগ্নাবশেষ। ৪১০ু ৪র্৪ উত্তর অক্ষাংশ ও ৫০০ ১র্৪ পশ্চিম দ্রাঘিমায় পানির ১৩ হাজার ফুট নিচে সমুদ্রের পলি ও কাদায় প্রোথিত টাইটানিকের অবশেষ যেন কোনো ট্র্যাজেডির অন্তিম দৃশ্য। শেলির কবিতার ওজিম্যানডিয়াসের মতো সমুদ্রের পানির নিচে বালি, পলি আর প্রবালের মৃতদেহের পাশে ছড়িয়ে আছে গত শতকের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অহমিকার শেষ চিহ্ন।
 
দুর্ঘটনায় চাঁদের প্রভাবঃ
টাইটানিকের অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন স্মিথ এ পথে অসংখ্যবার জাহাজ চালিয়েছেন। কোনোদিন বিন্দু পরিমাণ ঝামেলার মুখ দেখেননি। তিনি শতভাগ নিশ্চিত ছিলেন টাইটানিকের চলার পথে কোনো বাধা নেই। পর্বতসমান আইসবার্গের কথা তিনি কল্পনায়ও আনতে পারেননি। ওই অঞ্চলে বড় আইসবার্গ থাকার কথা নয়। তাহলে ওই আইসবার্গ এলো কীভাবে? এ প্রশ্নের জবাব নিয়ে এসেছেন টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিদরা। তারা বলেছেন, যে পর্বতসহ আইসবার্গে ধাক্কা খেয়ে টাইটানিকের সলিল সমাধি হয়েছিল সেই আইসবার্গ জন্ম নিয়েছিল গ্রিনল্যান্ডে! গ্রিনল্যান্ডে জন্ম নেওয়া আইসবার্গগুলো অপেক্ষাকৃত অগভীর পানি অঞ্চলে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থিরভাবে দলবেঁধে ভাসতে থাকে। এখান থেকে বড় আকারের আইসবার্গ বিচ্ছিন্ন হয় না। এ আইসবার্গ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে যে পরিমাণ স্রোতের প্রয়োজন তা ওই এলাকায় ছিল না। কিন্তু সেই শক্তির স্রোত একদিন সেখানে তৈরি হয়েছিল। সেই দিনটি ছিল ১৯১২ সালের ৪ জানুয়ারি। সেদিন চাঁদ এবং সূর্য এমন অবস্থানে এসেছিল, যে অবস্থানে সর্বোচ্চ মাত্রার মধ্যাকর্ষণ শক্তি তৈরি হয়। সেদিন চাঁদ পৃথিবীর এত কাছে চলে এসেছিল, যা প্রতি ১৪০০ বছরে মাত্র একবার ঘটে! হয়তো একেই বলে মহাজাগতিক রহস্য। যা ১৪০০ বছরে একবার ঘটে সে ঘটনা চাঁদ-সূর্যের বেলায় ঘটে গেল পর পর দুই দিন! এ জন্য এই দুই দিন তৈরি হয়েছিল ১৪০০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতার জোয়ার। জোয়ার-ভাটায় চাঁদ ও সূর্যের প্রবল প্রভাবের ফলে এমন শক্তির স্রোত তৈরি হয়েছিল, যা ল্যাব্রাডর এবং নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের 'বরফ মহাদেশ' থেকে পর্বত আকারের বহুসংখ্যক আইসবার্গকে ছিন্ন-বিছিন্ন করে ফেলেছিল। সেই জোয়ারের তোড়েই মুক্ত আইসবার্গগুলো ভাসতে ভাসতে হাজির হয়েছিল আটলান্টিকের জাহাজ চ্যানেলে টাইটানিকের চলার পথে। সেই আইসবার্গের ধাক্কাতেই ১৪ এপ্রিল রাতে লেখা হয়ে যায় টাইটানিক নামক উপাখ্যানের শেষ অধ্যায়।

দুর্ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাঃ
বিশেষজ্ঞরা প্রতিনিয়ত খুঁজে বেড়াচ্ছেন নতুন নতুন তথ্য। অনেক বিশেষজ্ঞের অভিমত, জাহাজের মধ্যে রিভেটের গোলযোগের জন্যই যে টাইটানিক ডুবেছিল, সে বিষয়ে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও নথিপত্র পাওয়া যায়। জাহাজে ব্যবহার করা রিভেটগুলো কেবল দুর্বলই ছিল না, রিভেটের ডিজাইনিংয়ে ছিল অনেক ত্রুটি। টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ ঘেঁটে ডুবুরিরা উদ্ধার করে দুটি লোহার রিভেট। মরচে পড়া লোহার ওই রিভেট দুটি পরীক্ষা করে এর চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। রিভেটের কেমিক্যাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, লোহার তৈরি রিভেটে অনেক গাদ ছিল। ভেজাল মেশানো ওই লোহাই নাকি দুর্বল করে দিয়েছিল রিভেটগুলোকে। যে অনুসন্ধানী দলটি টাইটানিকের রিভেট নিয়ে তদন্ত করে, তার প্রধান উইলিয়াম এইচ গারজক ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণীর নৌ-স্থপতি বিশেষজ্ঞ। তার মতে, হিমশৈলের ধাক্কায় রিভেট খুলে যাওয়ায় হু হু করে পানি ঢুকতে শুরু করেছিল টাইটানিকে। টাইটানিকের মতো বড় জাহাজকে ভাসিয়ে রাখার জন্য এর মধ্যে ১৬টি হাওয়া প্রকোষ্ঠ ছিল। বলা হয়েছিল একসঙ্গে চারটি প্রকোষ্ঠে পানি ঢুকে পড়লেও প্লাবতা (বুয়োয়েন্সি) নষ্ট হবে না। কিন্তু ঘটনাচক্রে পানি ঢুকে পড়ে ছয়টি প্রকোষ্ঠে। (আবার অনেকের মতে, আটটি প্রকোষ্ঠে) এর ফলে ডুবে যায় টাইটানিক। আগে মনে করা হতো হিমশৈলের ধাক্কায় জাহাজের খোলের ইস্পাতগুলো ফেটে যাওয়াতেই বুঝি ঘটেছিল এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। কিন্তু গারজকের দেওয়া তথ্য সম্পূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে নিয়ে গেছে অন্যদিকে। অবশ্য এর বিরোধিতাও করেছেন অনেকে। টাইটানিক জাহাজের খোলের ইস্পাতের পাতগুলো জুড়তে ৩০ লাখেরও বেশি লোহার রিভেট লেগেছিল। তাদের মতে, দুটি মাত্র রিভেটের লোহায় ভেজাল থাকলেই প্রমাণ হয় না, প্রতিটি রিভেটেই একই ধরনের গাদ মেশানো ছিল। তবে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের মতে, জাহাজের ইস্পাতের পাত নয় রিভেটের জোড়া খুলেই পানি ঢুকেছিল জাহাজে।


টাইটানিক হারিয়ে যাওয়ার গল্পঃ
১৪ এপ্রিল, রাত প্রায় ১২টা। আটলান্টিক সাগরের বুকে ভেসে যাচ্ছে টাইটানিক। তখন টাইটানিক আমেরিকার কাছাকাছি চলে এসেছে, গ্র্যান্ড ব্যাংকস অফ নিউফাউন্ডল্যান্ডে। আবহাওয়া খুবই খারাপ; ভীষণ ঠাণ্ডা আর জমাট বাঁধা কুয়াশা। নিউফাউন্ডল্যান্ড পার হয়ে যাওয়া জাহাজগুলো এর মধ্যেই এখানকার ভাসমান বরফ, মানে আইসবার্গ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছে টাইটানিককে। কিন্তু টাইটানিকের ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড জন স্মিথ আর অন্যান্য ক্রুরা তো তাদের এসব কথাকে পাত্তাই দেননি। তাদের ভাবখানা এমন- কোথাকার কোন বরফ নাকি টাইটানিককে ডোবাবে! টাইটানিক আগের মতোই ২১ নটিক্যাল মাইলে (২৪ মাইল) চলতে লাগলো। ২১ নটিক্যাল মাইলকে আবার কম ভেবো না; তখন টাইটানিক ছিল অন্যতম দ্রুতগতির জাহাজ, আর তার সর্বোচ্চ গতিই ছিল ২৪ নটিক্যাল মাইল।

ওদিকে জাহাজের সামনে কোনো বাধা আছে কিনা দেখার জন্য জাহাজের ডেকে একটা উঁচু টাওয়ারের মতো থাকে। সেখানে পালা করে কয়েকজন চোখ রাখে। তখন সেখানে ছিলেন ফ্রেডরিক ফ্লিট। হঠাৎ তিনি দেখলেন, কুয়াশার আড়াল থেকে বের হয়ে এল এক বিশাল আইসবার্গ। আইসবার্গ হল সাগরের বুকে ভাসতে থাকা বিশাল বিশাল সব বরফখণ্ড। এগুলোর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এগুলোর মাত্রই আট ভাগের এক ভাগ পানির উপরে থাকে। মানে, এর বড়ো অংশটাই দেখা যায় না। আর বরফের রংও তো কুয়াশার মতোই সাদা, তাই ফ্লিটও প্রথমে ওটাকে আলাদা করে চিনতে পারেনি। যখন দেখতে পেল, ততোক্ষণে আইসবার্গটি অনেক কাছে চলে এসেছে। ফ্লিট তো আইসবার্গ দেখেই খবর দিতে ছুটলো। ফার্স্ট অফিসার উইলিয়াম মারডক শুনেই জাহাজ পিছনের দিকে চালাতে বললেন। আর মুখ ঘুরিয়ে দিতে বললেন অন্যদিকে। যাতে কোনভাবেই বিশাল ওই আইসবার্গটির সঙ্গে টাইটানিকের সংঘর্ষ না হয়। কিন্তু লাভ হলো না। টাইটানিকের স্টারবোর্ডে আইসবার্গ ধাক্কা খেল। আর তাতে টাইটানিকের পানির নিচে থাকা অংশে অনেকগুলো গর্ত হলো। পানি ঢুকতে লাগলো দৈত্যাকার জাহাজের খোলের ভেতর।

কিছুক্ষণের মধ্যেই এটা পরিস্কার হয়ে গেল, লোকজন যে জাহাজকে ভাবছিল কখনোই ডুববে না, সেই জাহাজই ডুবে যাচ্ছে তার প্রথম যাত্রাতেই। এবার যাত্রীদের লাইফবোটে তুলে পার করে দেওয়ার পালা। কিন্তু কেউ তো এ নিয়ে ভাবেই নি। লাইফবোট যা আছে, তা দিয়ে বড়োজোর মোট যাত্রীদের তিন ভাগের এক ভাগকে বাঁচানো যাবে। তখন এক বিশেষ নীতি অনুসরণ করা হলো- শিশু এবং নারীদেরকে প্রথমে লাইফবোটে করে পাঠানো হতে লাগলো। এমনি করে কোনো রকমে বিশাল টাইটানিকের মোটে ৩২ শতাংশ যাত্রীদের বাঁচানো গেল। মাত্র ঘণ্টা চারেকের মধ্যে ডুবে গেল সুবিশাল টাইটানিক, ১৫ এপ্রিল রাত ২টায়। টাইটানিকের সঙ্গে আটলান্টিকে ডুবে গেল প্রায় ১৫ শ' মানুষ। মানুষের ইতিহাসেই এরকম বড়ো দুর্ঘটনা আর ঘটেছে কিনা সন্দেহ। টাইটানিক তো ডুবে গেল আটলান্টিকে, কিন্তু আটলান্টিকের বুকে তার কী হলো? কেউ কেউ বললো, টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। কেউ বললো, টুকরো টুকরো হবে কেন, দুভাগ হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু যতো গভীরে আছে, সেখান থেকে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা সম্ভব নয়। উদ্ধার কেন, চিহ্নিত করাই তো অসম্ভব। এমনি করেই আড়ালে চলে গেল হোয়াইট স্টার লাইন কোম্পানির জাহাজটি।

টাইটানিক খুঁজে পাওয়ার গল্পঃ
কিন্তু টাইটানিককে বেশিদিন চোখের আড়ালে থাকতে দিলেন না রবার্ট বালার্ড। ফরাসি এই বিজ্ঞানীর ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল টাইটানিককে খুঁজে বের করবেন। বড়ো হয়ে তিনি সেই কাজেই নামলেন। ১৯৮৫ সালে তিনি জাহাজ নিয়ে ঘাঁটি গাড়লেন গ্রেট ব্যাংকস অফ নিউফাউন্ডল্যান্ডে, যেখানে ডুবে গিয়েছিল টাইটানিক। সঙ্গে নিলেন নানা আধুনিক যন্ত্রপাতি। আর্গো নামের একটি আন্ডারওয়াটার ক্র্যাফট পাঠিয়ে দিলেন সাগরতলে। আর্গো সাগরতলের দৃশ্য ভিডিও করে নিয়ে আসতো। কিন্তু কিছুতেই পাওয়া গেল না টাইটানিককে। হতাশ হয়ে পড়লেন বালার্ড। এদিকে টানা পরিশ্রমে তার শরীরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। একটু বিশ্রাম দরকার তার। কিন্তু কীসের বিশ্রাম! যেই একটু ঘুমুতে গেলেন, অমনি তার ডাক পড়লো। আর্গোর ভিডিওতে মেটাল অবজেক্ট পাওয়া গেছে, যেগুলো শুধু কোনো জাহাজ থেকেই ভেসে আসা সম্ভব। উত্তেজনায় যা ঘুম ছিল, সব চলে গেল বালার্ডের। একটু খোঁজাখুজির পর জাহাজটিকে পাওয়া গেল। হ্যাঁ, এটাই টাইটানিকের দৈত্যাকৃতির ধ্বংসাবশেষ।

এবার আর্গোকে দিয়ে নানা দিক দিয়ে টাইটানিকের ছবি তুললেন বালার্ড। দেখলেন টাইটানিকের যাত্রীদের নানা স্মৃতিচিহ্ন- বিছানা, সুটকেস, কাপ- প্লেট, আর অসংখ্য জুতো। যেন সাগরতলের এক জাদুঘরের ভিডিও দেখছেন তিনি। কিন্তু সময় ফুরিয়ে এল। তাকেও ফিরে যেতে হলো। তখনই ঠিক করলেন, আবার আসবেন টাইটানিকের কাছে। পরের বছরই আবার এলেন বালার্ড। এবার আরো প্রস্তুত হয়ে। ছোট্ট একটা সাবমেরিনে চড়ে এলেন বালার্ড। সাথে নিয়ে এলেন সাগরতলে ঘোরাঘুরি করতে পারে, এমন একটি রোবটও; নাম তার জেজে। বালার্ড অবশ্য ওকে বলতেন- সুইমিং আইবল। জেজের সাহায্যে তিনি দেখলেন পুরো টাইটানিককে; এর বিশাল সিঁড়িটা এখন কেমন আছে, কেমন আছে ওর জিম, চেয়ার, ঘর, সব।

বালার্ডের টাইটানিক আবিষ্কার তো হলো, কিন্তু তিনি জানতে চাইলেন, কীভাবে ডুবে গেল টাইটানিক। আর তা বোঝার জন্য আবারো তিনি গেলেন টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষে, ২০০৪ সালের জুন মাসে। এবার গিয়ে কিন্তু তার মনই খারাপ হয়ে গেল। বালার্ড টাইটানিক আবিষ্কার করার পর থেকেই মানুষ সাবমেরিনে করে সেখানে ঘুরতে যায়। এই সাবমেরিনগুলো টাইটানিকের যে সব জায়গায় ল্যান্ড করে, সেসব জায়গাতে দাগ তো পড়েছেই, অনেক জায়গায় গর্তও হয়ে গেছে। আর মানুষ জাহাজ থেকে প্রায় ৬ হাজার জিনিস নিয়ে গেছে। এমনকি অনেকে নিয়ে গেছে জাহাজের টুকরোও!

সূত্রঃ   বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১২ এপ্রিল ২০১২ খ্রিঃ, বিডি নিউজ২৪, ১১ এপ্রিল ২০১২।

1 টি মন্তব্য:

Comments করার জন্য Gmail এ Sign in করতে হবে।