কী যে
ভালো আমার লাগেলা আজ এই সকাল বেলায় কেমন করে বলি! ওডিশার চিল্কা হ্রদ দেখে লিখেছিলেন
বুদ্ধদেব বসু। আর হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার পুটিজুরি বাজারে দি প্যালেস
রিসোর্টের ঝুলন্ত সেতুতে দাঁড়িয়ে বলতে হয়, আহা! এ কোথায় এলাম! এ তো রূপসী
বাংলাদেশের সুন্দরতম স্থান। জীবনানন্দর
ভাষায়, এই পৃথিবীতে একটা স্থান আছে—সবচেয়ে
সুন্দর করুণ।
যেদিকে
চোখ যায় সবুজ আর সবুজ। পাহাড় আর পাহাড়, গিরিখাদ, সরোবর, ৩০ হাজার
গাছে ঢাকা ১৫০ একর,
প্রকৃতি
যেন নিজের হাতে সাজিয়েছে পরিসরটুকু।
মেঘ–পাহাড়ের সাজেক ভ্যালি
চাঁদের গাড়ির ছাদের সামনের জায়গাটা
দখলে ছয় বছরের শিশু রবিউলের। তার
পাশে বসা ইশতিয়াক। আমার জন্যও
কিছুটা জায়গা বরাদ্দ আছে সেখানে। ফটোগ্রাফার
ওমর ভাই ছাদের পেছনে বসে খোশগল্প জমিয়ে তুলেছেন ব্যাংকার শান্তনু দেবনাথের সঙ্গে। তাঁদের স্ত্রীরাও আছেন সে আড্ডায়। সিস্টেম রেস্টুরেন্টের তরুণ বাবুর্চি
হাচিং মারমা দারুণ উচ্ছ্বসিত সাজেকের পথে যাত্রা করতে পেরে। খাগড়াছড়ির ছেলে হলেও কখনো সাজেক যাওয়া হয়নি তাঁর। সাজেক নিয়ে
আমার মধ্যে একদিকে যেমন দারুণ কৌতূহল, অন্যদিকে শিশু রবিউলকে নিয়ে চরম বিস্ময়! পাহাড়ি
পথে ভ্রমণ করতেই ভয় পান অনেকে। অথচ
এই পুঁচকে শিশু কিনা পুরো তিন ঘণ্টার পাহাড়ি পথে চাঁদের গাড়ির ছাদে!
জলের ধারে কিসের নাচন
জলের দিকে তাকিয়ে থাকে। নদীর জলরাশির ওপরে কিছু পানকৌড়ি, কাদাখোঁচা আর গাংচিলের ওড়াওড়ি চোখে পড়ে। আর
জলের পথে পথে ছোট মাছ ধরার নৌকায় জেলেদের রাজত্ব। ধান, নদী আর খালের বরিশােল এমন ছবি আপনার চোখে পড়তে
পারে। শীতের শুরুতেই দেখে এসেছিলাম এই বরিশাল। নদীর নাম কালাবদর। বরিশালের পাতারহাট থেকে লঞ্চঘাটে
যাওয়ার পথে পথে দূরের গ্রামগুলোতে ছোট ছোট পানের বরজ। বাঁশের কঞ্চি (স্থানীয়রা
বলেন জিংলা) আর পাটকাঠির বেড়ার ফাঁকে ফাঁকে সবুজ-সতেজ পানগাছ চোখ মেলে তাকাবে।
মাটিতে পানগাছ আর কম পানিতে আছে পাটিপাতা। এটি অবশ্য স্থানীয়ভাবে হোগলা বা
হোগলপাতা নামেও পরিচিত। চরের বরজগুলোতে অবশ্য কৃষক ছাড়া কারও প্রবেশের অনুমতি নেই।
বাইরে থেকে পানগাছ দেখে তুষ্ট থাকতে হলো। পাতারহাট থেকে যাওয়ার পথে ছোট ছোট কয়েকটি
ঘাট পড়বে। এসব ঘাটে স্থানীয় কিছু পণ্যের বেচাকেনা চলে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হবে লেবু
আর মহিষের দই। আবার এই দুইয়ের মিশ্রণের স্বাদটাও আপনার কাছে অমৃত মনে হতে পারে।
আমরাও একটু চেখে দেখেছিলাম।
খোলা আকাশের নীচে...
লোকালয়ের
ঠিক পাশেই পাহাড়টি। সেই পাহাড়ে দিনভর রোদের আলো খেলা করে, হাজার পাখির মেলা বসে, আর সবুজের আসর জমে বছরের পর বছর। আঁকাবাঁকা এক ঝিরিপথে পাথর ডুবিয়ে চলে
ঠান্ডা পানির আয়েশি পথচলা, সে পানির ধার
ঘেঁষে এক পা ডুবিয়ে শিকারের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বসে থাকে সাদা বকের ঝাঁক।
আর দু-কূল ছাপানো বুনোগাছের আড়ালে কৌতূহলী চোখ মেলে চেয়ে থাকে বানরের দল, তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডাকে কোনো এক দলছুট পাহাড়ি হরিণ।
এমনই মায়া-ভালোবাসা আর আদর ঘিরে গড়ে ওঠা এই চিরসবুজের বনটা হঠাৎ করেই কেঁপে ওঠে পাশ
দিয়ে ছুটে চলা ট্রেনের শব্দে! কাদা-মাটি আর পিচ্ছিল পাথুরে ঝিড়িপথের জল-ঝরনাঘেরা
লোকালয়ের খুব কাছের এই জায়গাটির নাম সীতাকুণ্ড বন। এবারে আমরা তাঁবু গেড়েছিলাম
জল-ঝরনার এই বনে, তারার সঙ্গে
সারা রাত কথা বলেছিলাম অচিন পাথরের গায়ের ওপরে হেলান দিয়ে।
দ্বীপগ্রাম কাট্টলি বিল
জলাভূমি আর নীল আকাশের নিচে নিঃশব্দেই জেগে আছে কাট্টলি বিলের অনেকগুলো দ্বীপ। কাপ্তাই লেকের বিস্তৃত জলরাশির মাঝখানে এই দ্বীপগুলোতে গড়ে উঠেছে মানুষের বসতি।
মাছ শিকারকে কেন্দ্র করে দ্বীপের বুকে গড়ে উঠেছে বাজার। জেলেদের নৌকা মেরামতের সরঞ্জাম আর
শুটকিপল্লি গড়ে উঠেছে এই বাজারে।কাট্টলি বিলের দূরত্ব রাঙামাটি সদর
থেকে পানিপথে প্রায় চার ঘণ্টা। একমাত্র
বাহন লঞ্চ
বা দেশিবোট। আমাদের অবশ্য যাত্রাপথ ছিল লংগদু হয়ে। লংগদু থেকে কাট্টলি বিল দ্বীপের দূরত্ব প্রায়
দুই ঘণ্টারমতো।
Great Ocean Road-Australia

Great Ocean Road-Australia

সাগরের পাশ
দিয়ে পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ একটি রাস্তার নাম অস্ট্রেলিয়ার টুয়েলভ অ্যাপোস্টলসগ্রেট
ওশান ড্রাইভ। এটি ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যে এবং
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ঐতিহ্যখ্যাত একটি স্থাপনা। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪৭ কিলোমিটার। রাস্তাটি অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব সমুদ্র উপকূল ধরে ভিক্টোরিয়ার
টোরকে থেকে ওয়ার্নাম্বুল পর্যন্ত বিস্তৃত। সাগরের বিশালতা আর অসীম নীল জলরাশির গভীরতা ছুঁয়ে যায় প্রতিটি
মানুষের মনের আঙিনাকে। সঙ্গে
ঘন সবুজের সমারোহ, পাহাড় যদি সাগরের তীর ঘেঁষে প্রেমের আশ্রয়
চায় তাহলে তো কথাই নেই! প্রকৃতির এই নৈসর্গিক প্রেম, পাগল
করা মন মাতানো রূপের গভীরে আমি হারাই প্রতিবার, প্রতিমুহূর্ত,
সে এক অন্য প্রহর! অনিন্দ্যসুন্দর আর নির্জনতা এত বেশি
মোহাচ্ছন্ন করে তোলে আমাকে, অবচেতন মনেই গেয়ে উঠি ‘রূপের ওই প্রদীপ জ্বেলে কী হবে, তোমার কাছে কেউ
না এলে আর মনের ওই এত মধু কেন জমেছে, যদি কেউ না থাকে
নেবার।




